গাম্বিয়ার প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ক্রুবালি। আদালতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি চোখে দেখতে পান না, তবে কণ্ঠস্বর, স্মৃতিশক্তি, অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পরিচালনা করেন বিচারকাজ। তার এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশটির বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলোও সামনে নিয়ে এসেছে।
সকালে বানজুল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৌঁছান ক্রুবালি। দিনের প্রথম মামলার শুনানি শুরুর আগে তার সহকারী মামলার নথিপত্র ও কার্যক্রম সম্পর্কে তাকে বিস্তারিত জানান। ক্রুবালি মনোযোগ দিয়ে শোনেন, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করেন এবং বিচারকাজের প্রস্তুতি নেন। এরপর তিনি প্রবেশ করেন আইনজীবী, সাক্ষী ও মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে পূর্ণ আদালতকক্ষে। সবাই নিজ নিজ জায়গায় বসেন। শুরু হয় বিচারিক কার্যক্রম।
আদালতে উপস্থিত ব্যক্তিদের দেখতে না পেলেও তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পান ক্রুবালি। কোনো আইনজীবী দাঁড়িয়ে কথা বলেন, সাক্ষী তাঁর বক্তব্য দেন, এদিক-ওদিক চলে মামলার কাগজপত্র। পাশে থাকেন তার সহকারী।
নিজের ডেস্কে থাকা কম্পিউটারের সহায়তাও নেন তিনি। ক্রুবালি ব্যবহার করেন ‘জব অ্যাকসেস উইথ স্পিচ’ বা জেএডব্লিউএস নামের একটি স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার। এর মাধ্যমে কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করা এবং নথি ও রায় পড়ে শোনা তার পক্ষে সম্ভব হয়।
আলজাজিরাকে ক্রুবালি বলেন, ‘এটি আমার কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।’ তথ্য সংগ্রহ ও বিভিন্ন কাজ স্বাধীনভাবে সম্পন্ন করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিসম্পন্ন স্মার্ট চশমাও ব্যবহার করেন তিনি। তবে প্রযুক্তিই তার কাজের একমাত্র অবলম্বন নয়। আদালতের বিভিন্ন কণ্ঠস্বর শুনে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রেখে এবং বিচারিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে পরিস্থিতি বুঝে নেন তিনি। প্রয়োজন হলে সহকারীর সাহায্য নেন।
৪১ বছর বয়সী ক্রুবালির ভাষ্য, বিচারক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলিয়ে এক হাজারের বেশি মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
২০১৬ সালে গাম্বিয়ার প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। দেশটির দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন গাম্বিয়া অর্গানাইজেশন অব দ্য ভিজ্যুয়ালি ইমপেয়ার্ডও (জিওভিআই) তাকে এই পদে অধিষ্ঠিত দেশের প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ক্রুবালির কাছে তার এই দায়িত্ব পালন কোনো পরীক্ষা নয়, যেখানে যাচাই করা হচ্ছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী একজন মানুষ কী করতে পারেন। এটি তার পেশা। আর এক দশক ধরে তিনি সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিচারকের আসনে বসার বহু আগে গাম্বিয়ার সেন্ট্রাল রিভার অঞ্চলের একটি গ্রামে বেড়ে ওঠেন ক্রুবালি। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল আইনজীবী হওয়ার।
নিজের অধিকার রক্ষার আকাঙ্ক্ষা থেকে এই স্বপ্নের জন্ম হলেও পরবর্তী সময়ে অন্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পক্ষে কথা বলতে চেয়েছিলেন তিনি।
ক্রুবালির ভাষায়, তিনি হতে চেয়েছিলেন ‘যাদের কথা কেউ শোনে না, তাদের কণ্ঠস্বর’। তবে তার এই পথচলা সহজ ছিল না। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাজীবনে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে সহপাঠীদের তুলনায় তাঁকে বেশি বাধা পেরোতে হয়েছে।
সহপাঠী ও কয়েকজন শিক্ষকের কাছ থেকেও নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। কিন্তু এসব বাধা তাকে স্বপ্ন থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং নিজের লক্ষ্যে আরও দৃঢ় হয়েছেন তিনি। ক্রুবালি বলেন, ‘তাদের নিরুৎসাহই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আমি জানতাম, আমি কী চাই। আর আজ আমি কোথায় পৌঁছেছি, তা দেখুন।’
পরবর্তী সময়ে এসব অভিজ্ঞতাই তাঁকে বিচার বিভাগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, ‘ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে এবং এটিকে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে আমি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছি।’ তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পাওয়ার পরও সব বাধা দূর হয়ে যায়নি।
গাম্বিয়ায় ২০২১ সালে পাস হয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক আইন। এতে স্বাধীনতা, বৈষম্যহীনতা, সমাজে পূর্ণ অংশগ্রহণ, সমান সুযোগ এবং প্রবেশগম্যতার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান, সরকারি ভবন ও সেবা, তথ্যপ্রাপ্তি এবং বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও আইনটিতে বিভিন্ন বিধান রয়েছে। তবে এসব অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
গাম্বিয়ার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য এবং সেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে নানা বাধার বিষয়টি তুলে ধরেছে। আইনটি বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রবেশগম্যতা বাড়াতে সরকার কী করছে, তা জানতে আলজাজিরা দেশটির নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে মন্ত্রণালয় কোনো জবাব দেয়নি।
বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও যুক্ত ক্রুবালি। তিনি গাম্বিয়া ফেডারেশন অব দ্য ডিজঅ্যাবলডের সভাপতি। দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সক্ষমতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।
ক্রুবালি বলেন, ‘আমি সবার জন্য একটি পৃথিবী দেখতে চাই। অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।’ তার মতে, অন্তর্ভুক্তি মানে শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া নয়; সেখানে প্রবেশের পর স্বাধীনভাবে কাজ ও অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পূর্ণাঙ্গ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার লড়াই শুরু হয় অনেক আগেই—আদালত বা সংসদে প্রবেশের আগে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
গাম্বিয়ার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন জিওভিআই পরিচালিত রিসোর্স সেন্টার ফর দ্য ব্লাইন্ডে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষায়িত শিক্ষা দেওয়া হয়। পরে তাদের সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়ার কথা। কেন্দ্রটির প্রধান লামিন কলি আলজাজিরাকে জানান, বর্তমানে সেখানে ৪ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪৯ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
বিশেষায়িত কেন্দ্রে পড়াশোনা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। সেখানে বিভিন্ন বিদ্যালয়গুচ্ছে নিয়োজিত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সহায়তাকারী শিক্ষকদের তাদের পাশে থাকার কথা। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এই সহায়তা অপ্রতুল।
কলি জানান, শিক্ষা উপকরণের স্বল্পতা এবং একটি শিক্ষককে অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেখভাল করতে হওয়ায় সহায়তা কার্যক্রম চাপে রয়েছে। একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সহায়তাকারী শিক্ষকের পক্ষে একাধিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা কঠিন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক আইন পাস হওয়ার পর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি।’ কলির মতে, জাতীয় বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ না থাকাও এর অন্যতম কারণ।
ক্রুবালির শিক্ষাজীবনের স্মৃতিচারণা করে কলি জানান, ছোটবেলা থেকেই বই পড়তে ভালোবাসতেন তিনি। প্রায়ই তাকে গ্রন্থাগারে দেখা যেত। দৃষ্টিসম্পন্ন সহপাঠীদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার প্রতিও তার আগ্রহ ছিল।
বহু বছর পর ক্রুবালির সাফল্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। তার জীবন থেকে উঠে আসা বার্তাটি স্পষ্ট—‘প্রতিবন্ধিতা মানেই অক্ষমতা নয়।’ তবে একজনের সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামনে থাকা বাধাগুলো দূর করে দেয় না।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও সেখানে স্বাধীনভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে নডে ইয়াসিন সেকা-সাল্লারও। তিনি গাম্বিয়ার জাতীয় সংসদে মনোনীত সদস্য ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। জিওভিআই তাঁকে দেশটির একমাত্র দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংসদ সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে প্রচার এবং তাদের সুরক্ষায় শক্তিশালী আইন প্রণয়নের উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু সংসদে আসন পাওয়ার পরও সেখানে কার্যক্রম অনুসরণ করা তার জন্য সহজ ছিল না। আলজাজিরাকে সেকা-সাল্লা বলেন, ‘সংসদে কী আলোচনা হচ্ছে, তা জানার জন্য আমাকে সহকর্মীদের ওপর নির্ভর করতে হতো।’
অন্যের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে খুশি হতাম।’ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক আইন পাসের পাঁচ বছর পরও এর বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সেকা-সাল্লা।
ক্রুবালির বিচারক হিসেবে নিয়োগকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখলেও তিনি মনে করেন, অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু অন্তর্ভুক্তি চাই।’ গাম্বিয়ার আরেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পেশাজীবী মুসা ব্যারো সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যম আইন ও নৈতিকতা পড়ান।
ক্রুবালির মতো তিনিও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্ষমতা নিয়ে মানুষের পূর্বধারণার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, কোনো কোনো শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী একজন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না।
তবে প্রযুক্তির সহায়তায় স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন ব্যারো। ডিজিটাল বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে তিনি পড়াশোনা, লেখালেখি ও পাঠদানের নোট তৈরি করেন। ব্যারো বলেন, ‘প্রযুক্তি আমার জন্য সেই বাধা ভেঙে দিয়েছে।’
তবে মানুষের পূর্বধারণা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। এর জবাবে নিজের সক্ষমতার ওপর আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের চেয়েও আমি বেশি কিছু করতে পারি।’ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ার অভিজ্ঞতা তার পাঠদানের ধরনেও প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কীভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা নিয়ে আলোচনার সময় নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগান তিনি।
ক্রুবালি, সেকা-সাল্লা ও ব্যারোর অভিজ্ঞতা একই বাস্তবতা তুলে ধরে—কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ পাওয়া আর সেখানে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সহায়তা পাওয়া এক বিষয় নয়। গাম্বিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিমাপ করাও কঠিন।
দেশটির ২০১৩ সালের জনসংখ্যা ও গৃহগণনায় প্রতিবন্ধিতার হার ছিল ১ দশমিক ২ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ওই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তখন দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৮৭৩ জন। তবে প্রকৃত পরিস্থিতির তুলনায় এই সংখ্যা কম হতে পারে। কারণ, ওই আদমশুমারিতে প্রতিবন্ধিতা শনাক্ত করার জন্য সীমিতসংখ্যক প্রশ্ন ব্যবহার করা হয়েছিল। কার্যক্ষমতার সীমাবদ্ধতা পরিমাপের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত ‘ওয়াশিংটন গ্রুপ’ প্রশ্নমালাও ব্যবহার করা হয়নি।
এরপর গাম্বিয়ায় নতুন জনসংখ্যা ও গৃহগণনা হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এর প্রাথমিক ফল প্রকাশ করা হলেও প্রতিবেদনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে হালনাগাদ বিস্তারিত জাতীয় পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে গত এক দশকে দেশটির প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতিতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন।
তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা থেকে সমস্যাগুলোর কিছু দিক স্পষ্ট। সংসদের কার্যক্রম বুঝতে একজন সদস্যকে সহকর্মীদের ওপর নির্ভর করতে হয়, একজন শিক্ষককে নিজের পেশাগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, আবার সাধারণ বিদ্যালয়ে যাওয়া শিশুরা পর্যাপ্ত বিশেষায়িত সহায়তা পায় না। এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছেন ক্রুবালি।
বর্তমানে তিনি তরুণদের পরামর্শ দেন এবং তাদের এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন। তাদের অনেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এমনই একজন তরুণ মোদু লামিন ডামফা। ক্রুবালিকে নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজের স্বপ্ন অনুসরণ করে যেতে উৎসাহ দেন এই বিচারক।
ডামফার ভাষায়, ‘তিনি আমাকে পরামর্শ দেন, উৎসাহিত করেন এবং বলে দেন—এগিয়ে যেতে হবে, অনেক কিছুই সম্ভব।’ ডামফার কাছে ক্রুবালি শুধু একজন ম্যাজিস্ট্রেট নন। তিনি এমন এক উদাহরণ, যার জীবন দেখায়—প্রতিবন্ধিতা পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে শেষ বাধা হতে পারে না।
বানজুল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফিরে এলে দেখা যায়, বিচারিক কার্যক্রম চলছে। ক্রুবালি কণ্ঠস্বর, স্মৃতিশক্তি, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে শুনানি অনুসরণ করছেন। তবে তার কর্মজীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিচারককে নিজের কাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এক দশক সময় দিতে হয়েছে; এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি নিজে কতটা বদলেছে?
গাম্বিয়ার বিচার বিভাগের কাছে আলজাজিরা জানতে চেয়েছিল, ক্রুবালির কাজের জন্য কী ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, বিচারক ও আদালতে আসা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ২০২১ সালের আইন পাসের পর কী কী পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত বিচার বিভাগ কোনো জবাব দেয়নি।
এক দশক ধরে আদালতের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে নিজের কর্মপদ্ধতিকে উপযোগী করে তুলেছেন ক্রুবালি। কিন্তু তার কাজের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিচারব্যবস্থার কাঠামো কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে ক্রুবালি বলেন, নিজের জীবনে অতিক্রম করা বাধাগুলো নিয়ে তিনি ভাবেন না। বরং সামনে কী কী সম্ভব, সেটিই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার কথায়, ‘আমি শুধু সম্ভাবনাই দেখতে পাই।’
সূত্র: আলজাজিরা
